শ্বেতপাথরের দোল ও একমুঠো আবির
অভিজিৎ হালদার
গ্রামের শেষ প্রান্তে সেই পুরনো জমিদার বাড়িটা এখন শ্যাওলা ধরা ইটের স্তূপ। কিন্তু এই বাড়ির আনাচে-কানাচে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত প্রেমের গন্ধ। বাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী অনিমেষ। সে পেশায় স্থপতি, কিন্তু মনের গহীনে সে একজন নিভৃতচারী কবি। প্রতিবার দোলের সময় সে শহর ছেড়ে এই ভাঙাচোরা ভিটেয় ফিরে আসে।
কেন আসে, তার উত্তর কেউ জানে না। শুধু জানে সেই ধুলো পড়া ডায়েরিটা, যা সে বুক পকেটে আগলে রাখে।
অনিমেষ যখন বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে ছিল, তখন ঝিরঝিরে বাতাসে উঠোনের বিশাল পলাশ গাছটা থেকে টকটকে লাল ফুলগুলো ঝরে পড়ছিল। ঠিক দশ বছর আগে এই উঠোনেই সে প্রথম দেখেছিল মৃন্ময়ীকে। মৃন্ময়ী ছিল পাড়ার চঞ্চল মেয়ে, যার হাসিতে রোদেলা দুপুরের মায়া লেগে থাকত।
সেদিন ছিল দোল। মৃন্ময়ী সাদা শাড়ি পরে হাতে এক থালা আবির নিয়ে অনিমেষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
"অনি দা, তোমাকে আজ লাল রঙে রাঙাবো না, কারণ তুমি তো নিজেই একলা পলাশ!"
অনিমেষ হেসেই সারা। সে বুঝতে পারেনি, মৃন্ময়ীর সেই ঠাট্টার আড়ালে কতখানি গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।
মৃন্ময়ীর বিয়ে হয়ে গেল অন্য শহরে। অনিমেষ বাধা দেয়নি, কারণ সে জানত এক মধ্যবিত্ত কবির ডায়েরিতে রাজপ্রাসাদ গড়া যায় না। বিচ্ছেদের পর অনিমেষ নিজেকে গুটিয়ে নিল। তার কবিতাগুলো হয়ে উঠল ফ্যাকাসে। দোল উৎসব তার কাছে হয়ে দাঁড়াল এক বিষণ্ণ বিসর্জনের দিন।
পরের বছরগুলোতে দোলের দিন সে শুধু একা এই জমিদার বাড়ির শ্বেতপাথরের মেঝেতে বসে থাকত। চারিদিকে যখন 'হোলি হ্যায়' চিৎকার শোনা যেত, অনিমেষ তখন তার ডায়েরিতে লিখত—
"রঙের উৎসবে সবাই যখন মাতে,
আমি তখন খুঁজি তোমায়, ধূসর কোনো পাতে।
পলাশ ঝরেছে আজো সেই চেনা উঠোনে,
তুমি রয়ে গেছ শুধু আমার একলা মনে।"
গত বছর দোলের কয়েকদিন আগে খবর এল, মৃন্ময়ী আর নেই। এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার সব রঙ মুছে গেছে। অনিমেষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাহাকার কাকে বলে, সে সেদিন নতুন করে চিনেছিল। প্রকৃতির সেই চিরচেনা রূপ তার কাছে তখন শত্রু মনে হচ্ছিল।
আজ সেই ঘটনার পর প্রথম দোল। অনিমেষের হাতে আজ কোনো লাল বা নীল আবির নেই। তার হাতে আছে এক মুঠো সাদা চন্দন। মৃন্ময়ী সাদা রঙ খুব ভালোবাসত। সে বিশ্বাস করত, সাদা মানে শান্তি, সাদা মানে পবিত্রতা।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে অনিমেষ ডায়েরিটা নিয়ে পলাশ গাছের নিচে গিয়ে বসল। চারপাশটা যেন আজ বড় বেশি নিস্তব্ধ। সে ডায়েরির পাতা খুলে দেখল সেখানে একটি শুকনো পলাশ ফুল চ্যাপ্টা হয়ে আছে—মৃন্ময়ীর দেওয়া শেষ স্মৃতি।
হঠাৎ এক ঝলক দমকা হাওয়া এল। উঠোনের লাল পলাশ ফুলগুলো অনিমেষের চারপাশে উড়তে লাগল। মনে হলো যেন প্রকৃতি নিজেই আজ দোল খেলছে। অনিমেষ তার হাতের চন্দনটুকু পলাশ গাছের গোড়ায় ছড়িয়ে দিল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল।
সে অনুভব করল, মৃন্ময়ী নেই ঠিকই, কিন্তু এই ঝরে পড়া পলাশ, এই বসন্তের হাওয়া আর এই একাকীত্বের মধ্যেই সে মিশে আছে। হতাশা আর দুঃখকে সে আজ জয় করল এক অদ্ভুত উপা
য়ে—ভালোবাসাকে মুক্ত করে দিয়ে।

