অদৃশ্য দেয়াল, নিঃশব্দ বিদায়
অভিজিৎ হালদার
২০২০ সালের মার্চের শেষ দিক। বসন্তের বাতাসটা তখনো মিলিয়ে যায়নি, কিন্তু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল এক অদৃশ্য ভাইরাসের আতঙ্ক। আচমকা ঘোষণা হলো দেশজুড়ে লকডাউন। সবাই যখন যে যার ঘরে ফেরার তাড়াহুড়ো করছিল, তখন কলকাতার এক ছোট্ট ভাড়া বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল অয়ন।
২৭ বছর বয়সী অয়ন একটা বেসরকারি সংস্থায় ছোটখাটো কাজ করত। মাস গেলে যা বেতন পেত, তাতে বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রী মালিনীর সংসারটা কোনোমতে চলে যেত। মালিনী আর অয়নের বিয়ের হয়েছে তখন মাত্র এক বছর। চোখে তাদের হাজারো রঙিন স্বপ্ন।
লকডাউনের প্রথম কয়েকটা দিন কেটেছিল এক অদ্ভুত পারিবারিক আবহে। অয়ন বাড়ি থেকে কাজ করছিল, আর মালিনী নতুন নতুন রান্না করে সবাইকে খাওয়াচ্ছিল। বাবা অবিনাশ বাবু আর মা সুমিত্রা দেবী ভাবতেন, ছেলেটা বড্ড খাটত, যাক এই বাহানায় কয়েকটা দিন বিশ্রাম পাচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের এই সুখের দিনগুলো যে কতখানি ক্ষণস্থায়ী, তা তারা কেউই টের পায়নি।
মে মাসের মাঝামাঝি। লকডাউন ক্রমশ বাড়ছে, আর তার সাথে বাড়ছে মানুষের অনিশ্চয়তা। একদিন বিকেলে অয়নের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা ইমেইল ভেসে উঠল। ইমেইলটা পড়ার পর অয়নের হাতের আঙুলগুলো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কোম্পানি লোক ছাঁটাই করছে, আর সেই তালিকায় অয়নের নামটাও আছে।
অয়ন স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল—রাস্তাঘাট একদম জনশূন্য, একটা কুকুর ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই বন্ধ খাঁচার মতো শহরে সে এখন কোথায় যাবে? কার কাছে কাজ চাইবে?
মালিনী ঘরে ঢুকে অয়নের মুখটা দেখেই বুঝতে পারল কিছু একটা মারাত্মক ঘটেছে। সে অয়নের পাশে বসে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
"কী হয়েছে অয়ন? অফিস থেকে কিছু বলেছে?"
অয়ন কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু মালিনীর কাঁধে মাথা রেখে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল। মালিনী তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
"কেঁদো না। চাকরি গেছে তো কী হয়েছে? তুমি সুস্থ আছো, আমরা সবাই একসাথে আছি, এটাই অনেক। ডাল-ভাত খেয়ে ঠিক দিন কেটে যাবে।"
মালিনীর সেই শান্ত কণ্ঠস্বর অয়নকে সেদিন শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু তারা জানত না, আসল ঝড় এখনো আসাই বাকি।
জমানো পুজি বলতে যা ছিল, তা জুনের শেষেই ফুরিয়ে এল। অবিনাশ বাবুর হার্টের ওষুধ আর সুমিত্রা দেবীর সুগারের ইনসুলিন কিনতে গিয়ে অয়নের পকেট শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ির মালিক ভাড়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল।
একদিন রাতে অয়ন দেখল, মালিনী রান্নাঘরে শুধু সামান্য ভাত আর নুন নিয়ে বসে আছে। তরকারি বলতে কিচ্ছু নেই। বাবা-মাকে ডিমের ডালনা খাইয়ে নিজেরা শুধু নুন-ভাত খাচ্ছে।
অয়ন মালিনীর হাত থেকে ভাতের থালাটা কেড়ে নিয়ে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও মালিনী। তোমাকে একটু ভালো রাখতে পারলাম না।"
মালিনী মৃদু হেসে অয়নের মুখে এক গ্রাস অন্ন তুলে দিয়ে বলল, "তুমি সাথে থাকলে এই নুন-ভাতও অমৃত, অয়ন। শুধু বাবা-মার ওষুধটা যেন বন্ধ না হয়, সেটুকু দেখলেই হবে।"
ভালোবাসার এই গভীরতা অয়নকে ভেতরে ভেতরে আরও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। সে মরিয়া হয়ে উঠল যেকোনো একটা কাজের জন্য। অবশেষে জুলাই মাসের শুরুতে সে একটা ওষুধ সরবরাহকারী সংস্থায় ডেলিভারি বয়ের কাজ পেল। ঝুঁকি ছিল চরম, কিন্তু পেটের খিদের কাছে ভাইরাসের ভয় হেরে গেল।
ডেলিভারি বয়ের কাজ করায় অয়নকে প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে আর কন্টেনমেন্ট জোনে যেতে হতো। মালিনী প্রতিদিন দরজার কাছে একটা স্যানিটাইজারের বোতল আর গরম জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। অয়ন বাড়ি ফিরলেই দূর থেকে বলত, "কাছে এসো না মালিনী, আগে নিজেকে পরিষ্কার করে নিই।"
জুলাই মাসের এক বৃষ্টিভেজা রাতে অয়ন যখন বাড়ি ফিরল, তার শরীরটা কাঁপছিল। প্রচণ্ড জ্বর আর শুকনো কাশি। মালিনী দূর থেকেই অয়নের চোখের ভাষা দেখে চিনে ফেলল—অদৃশ্য শত্রু তাদের ঘরেও থাবা বসিয়েছে।
পরদিন পরীক্ষা করার পর রিপোর্ট পজিটিভ এলো। শুধু অয়নের নয়, দুদিন পর অবিনাশ বাবু আর সুমিত্রা দেবীরও প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। পুরো বাড়িটা যেন একটা মিনি হাসপাতালে পরিণত হলো। মালিনী একাই সবাইকে সামলাতে লাগল। তার নিজের শরীরেও তখন মৃদু জ্বর, কিন্তু ভালোবাসার টানে সে নিজের কষ্টের কথা ভুলে গেল।
আগাস্টের এক অভিশপ্ত ভোরে অবিনাশ বাবুর শ্বাসকষ্ট চরম আকার ধারণ করল। ঘরের ভেতর অক্সিজেনের লেভেল নামতে নামতে ৭০-এ চলে এলো। অয়ন নিজে অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠে ফোনের পর ফোন করতে লাগল—একটা সিলিন্ডার বা একটা হাসপাতালের বেডের জন্য। কিন্তু চারদিকে শুধু 'নেই' আর 'নেই' শব্দ।
মালিনী অবিনাশ বাবুর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিল। অবিনাশ বাবু ঝাপসা চোখে অয়ন আর মালিনীর দিকে তাকালেন। অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, "অয়ন... তোর মাকে দেখিস... মালিনী, মা আমার, এই হতভাগা ছেলেটার হাত ছাড়িস না..."
কথাটা শেষ করতে পারলেন না অবিনাশ বাবু। তার হাতটা মালিনীর কোল থেকে মেঝেতে খসে পড়ল। চোখ দুটো খোলা রয়ে গেল, কিন্তু ভেতরের প্রাণপাখিটা লকডাউনের এই রুদ্ধশ্বাস শহর ছেড়ে চিরকালের মতো উড়ে গেল।
বাড়িতে কোনো আত্মীয় আসতে পারল না। পাড়ার কেউ ভয়ে দরজার কাছে ঘেঁষল না। প্রশাসনের একটা গাড়ি এসে অবিনাশ বাবুর মৃতদেহটা প্লাস্টিকে মুড়ে নিয়ে চলে গেল। অয়ন আর মালিনী বারান্দা থেকে শুধু দূর দিয়ে চলে যাওয়া সেই গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো কান্নাকাটি নেই—শুধু দুটো প্রাণহীন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল তারা। শোক প্রকাশের অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল লকডাউন।
মৃত্যুর ধাক্কা সহ্য করতে পারলেন না সুমিত্রা দেবী। স্বামীর চলে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় তিনিও চিরনিদ্রায় চলে গেলেন। অয়ন তখন জ্বরে সম্পূর্ণ অচেতন। মা-বাবার শেষকৃত্যে যাওয়ার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা তার ছিল না। মালিনী একাই সব সামলাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরের শক্তিটাও এবার ফুরিয়ে আসছিল।
আগাস্টের মাঝামাঝি অয়নের অবস্থার অবনতি হলো। নিউমোনিয়া তীব্র আকার ধারণ করায় তাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। মালিনী হাসপাতালের গেটের বাইরে একটা গাছের নিচে বসে থাকত দিন-রাত। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। শুধু নার্সরা যখন বাইরে আসত, মালিনী দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করত, "দিদি, অয়ন কেমন আছে?"
নার্সরা মুখ ঘুরিয়ে নিত। চারদিকে এত মৃত্যু যে, তারা যেন অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছিল।
একদিন বিকেলে একজন নার্স এসে মালিনীর হাতে অয়নের ভাঙা চশমা আর মানিব্যাগটা তুলে দিয়ে বলল, "ভেতরে যান। পেশেন্ট আপনাদের ডাকছে। আর বেশি সময় নেই।"
মালিনী যখন পিপিই কিট পরে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ঢুকল, চারদিকের অক্সিজেনের শোঁ শোঁ শব্দ আর মনিটরের বি fertilisers আওয়াজ তাকে স্তব্ধ করে দিল। বেডের ওপর শুয়ে থাকা অয়নকে চেনা যাচ্ছিল না। চুলে জট পেকে গেছে, চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, ঠোঁটগুলো শুকিয়ে কাঠ।
মালিনী অয়নের পাশে গিয়ে বসল। অয়নের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিল। সেই হাত, যা একসময় তাকে আগলে রাখত, আজ তা সম্পূর্ণ নিস্তেজ।
অয়ন চোখ খুলল। মালিনীকে দেখে তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। অক্সিজেনের মাস্কটা সরিয়ে সে খুব আস্তে বলল,
"মালিনী... আমি হার মেনে গেলাম রে... তোকে কথা দিয়েছিলাম সারাজীবন পাশে থাকব... পারলাম না..."
মালিনী নিজের কান্না চেপে অয়নের কপালে হাত বুলিয়ে বলল, "তুমি কোথাও যাচ্ছ না অয়ন। তুমি ঠিক হয়ে যাবে। দেখবে, লকডাউন কেটে গেলে আমরা আবার সেই ছোট্ট বারান্দায় একসঙ্গে চা খাব।"
অয়ন একটু হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুক অভিমান।
"মালিনী... আলমারির ভেতরের একটা নীল ডায়েরি আছে... ওটা একটু পড়িস... আর... নিজের খেয়াল রাখিস... আমি বাবা-মার কাছে চললাম..."
মনিটরের শব্দটা হঠাৎ সোজা লাইনে পরিণত হলো—পিপপপপপ...।
মালিনী চিৎকার করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু পিপিই কিটের ভেতরে তার সেই চিৎকার আটকে গেল। হাসপাতালের চাদরটা অয়নের মুখের ওপর টেনে দেওয়া হলো। লকডাউন অয়নের থেকে শুধু তার কাজ বা তার বাবা-মাকে কাড়েনি, কেড়ে নিল তার জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও।
লকডাউন একসময় শিথিল হলো। রাস্তাঘাটে আবার গাড়ি চলতে শুরু করল। মানুষ আবার চেনা ছন্দে ফিরতে লাগল। কিন্তু অয়নদের সেই ছোট্ট ভাড়া বাড়িটায় আর কোনো ছন্দ ফিরল না।
মালিনী এখন একাই থাকে। একা রান্না করে, একা খায়। শূন্য ঘরের দেওয়ালগুলো তাকে প্রতিদিন অয়ন আর তার বাবা-মার কথা মনে করিয়ে দেয়।
একদিন বিকেলে মালিনী আলমারি খুলে অয়নের সেই 'নীল ডায়েরি'টা বের করল। ডায়েরির শেষ পাতায় অয়নের হাতের লেখায় কিছু লাইন লেখা ছিল। সম্ভবত হাসপাতালে যাওয়ার আগের রাতে অয়ন এটা লিখেছিল:
"প্রিয় মালিনী,
জানি না এই লেখাটা তুই কখন পড়বি। হয়তো তখন আমি আর এই পৃথিবীতে নেই। লকডাউন আমাদের থেকে আমাদের হাসিমুখগুলো কেড়ে নিয়েছে। তোকে একটা ভালো শাড়ি দিতে পারলাম না, একবেলা পেট পুরে ভালো মন্দ খাওয়াতে পারলাম না—এই কষ্টটা আমি চিতাতেও নিয়ে যাব।
যদি পরের জন্মে আবার দেখা হয়, তবে এমন এক পৃথিবীতে আসব যেখানে কোনো ভাইরাস থাকবে না, কোনো লকডাউন থাকবে না। শুধু তুই থাকবি, আর আমি থাকব। তোকে অনেক ভালোবাসতাম রে মালিনী, অনেক ভালোবাসতাম..."
ডায়েরির পাতাটা মালিনীর চোখের জলে ভিজে ঝাপসা হয়ে গেল। মালিনী ডায়েরিটা বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
বিকেলের আলোটা তখন মরে আসছে। শহরের বুকে আলো জ্বলছে। সবাই কত ব্যস্ত, কত চেনা ছন্দে ফিরছে সবাই। কিন্তু এই আলোর শহরে মালিনীর জন্য চিরকালের মতো এক অন্ধকা
র লকডাউন নেমে এসেছে, যা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো চাবিকাঠি আর এই পৃথিবীতে নেই।

