নীল পলাশের হাহাকার
অভিজিৎ হালদার
আকাশের নীল আজ একটু বেশিই গাঢ়। শিমুল আর পলাশের ভিড়ে প্রকৃতি যেন নিজেকে উজাড় করে সাজিয়েছে। কিন্তু অয়ন দাঁড়িয়ে আছে জানলার ওপাশে, যেখানে বসন্তের হাওয়া তাকে আলিঙ্গন নয়, বরং চাবুক মারছে। আজ দোল। চারিদিকে ঢাকের বাদ্যি আর ‘ওরে গৃহবাসী’ গানের সুর ভেসে আসছে।
অয়নের হাতে একটা পুরনো ডায়েরি—তার নিজের লেখা ডায়েরি। নিজের নামটা সে এখন আর ব্যবহার করে না, কিন্তু এই ডায়েরিটাই তার সবটুকু হাহাকারের সাক্ষী। তিন বছর আগে ঠিক এই দিনেই তার জীবন থেকে সব রঙ হারিয়ে গিয়েছিল।
স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে অয়ন ফিরে গেল শান্তিনিকেতনের সেই দিনগুলোতে। নীলিমা ছিল বসন্তের মূর্ত প্রতীক। নীলিমা—যার নামের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আকাশের বিশালতা।
"অয়ন দা, এই পলাশটা আমার খোঁপায় গুঁজে দাও না!"—নীলিমার সেই আবদার আজও অয়নের কানে বাজে।
সেদিন শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে আবিরের ধুলো উড়ছিল। অয়ন আর নীলিমা একে অপরের কপালে পরম মমতায় আবির মাখিয়ে দিয়েছিল। সেই আনন্দ ছিল স্বর্গীয়। নীলিমা হাসলে তার গালে যে টোল পড়ত, সেখানে যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ এসে জমা হতো।
সেদিন অয়ন লিখেছিল:
"বসন্তের এই রাঙা দিনে, তোমার ওই রাঙা গালে,
একমুঠো আবির নয়, আমার ভালোবাসা এঁকে দিলাম অবহেলে।"
কিন্তু জীবন তো লিনিয়ার নয়। নীলিমার রক্তে ধরা পড়ল এক মারণ ব্যাধি। ব্লাড ক্যান্সার। যে মেয়েটি রঙ নিয়ে খেলত, তার জীবন ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হতে শুরু করল। বসন্ত এল, কিন্তু নীলিমার গায়ের রঙ আর গোলাপী হলো না, বরং তা হয়ে উঠল ফ্যাকাশে সাদা।
অয়ন দিনরাত হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকত। তার কবিতার ছন্দ হারিয়ে গেল। ডায়েরির পাতাগুলো ভরে উঠতে লাগল যন্ত্রণার কালিতে। হতাশা যখন গ্রাস করে, তখন চারপাশের উৎসবকেও উপহাস মনে হয়।
নীলিমা একদিন ক্ষীণ স্বরে বলেছিল, "অয়ন, পরের দোলে আমি হয়তো থাকব না। তুমি কি তখনো রঙ খেলবে?"
অয়ন উত্তর দিতে পারেনি। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল। প্রকৃতির এই নিয়ম বড় নিষ্ঠুর—একদিকে সে নিজেকে সাজায়, অন্যদিকে প্রিয়জনকে কেড়ে নেয়।
নীলিমা চলে গেল। ঠিক এক বছর আগের ফাল্গুনি পূর্ণিমায়। যেদিন সবাই আবির নিয়ে মাতোয়ারা, সেদিন অয়ন নীলিমাকে সাদা কাপড়ে ঢেকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছিল। আগুনের শিখা যখন নীলিমার নশ্বর দেহকে গ্রাস করছিল, অয়নের মনে হচ্ছিল তার হৃদয়ের সমস্ত বসন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
আজকের এই দোল উৎসবে অয়ন একা। জানলার বাইরে একদল তরুণ-তরুণী একে অপরকে রঙ মাখাচ্ছে। তাদের হাসি যেন অয়নের কানে হাহাকার হয়ে বাজছে। প্রকৃতি আজ বড়ই নির্মম। পলাশ গাছটা আগের মতোই ফুলে লাল হয়ে আছে, অথচ যার জন্য এই লাল রঙ প্রিয় ছিল, সে নেই।
অয়ন ঘর থেকে বের হলো। হাতে তার ডায়েরি আর এক প্যাকেট নীল আবির। সে শহরের ভিড় এড়িয়ে চলে গেল গঙ্গার ধারে। সেখানে একলা একটা পলাশ গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
গঙ্গার শান্ত জলরাশি আর পড়ন্ত বিকেলের রোদ মিলে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। অয়ন অনুভব করল, নীলিমা কোথাও হারিয়ে যায়নি। সে মিশে আছে এই বাতাসে, এই পলাশের লাল রঙে, গঙ্গার শীতল ছোঁয়ায়।
সে ডায়েরিটা খুলল। শেষ পাতায় লিখল:
"তুমি নেই বলে কি বসন্ত থেমে থাকে?
না, প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে নিজেকে সাজায়।
আমার হাহাকার আজ এই নীল রঙের সাথে মিশে যাক,
যে রঙে তুমি আকাশ হতে চেয়েছিলে।"
অয়ন একমুঠো নীল আবির আকাশের দিকে ছুড়ে দিল। বাতাসে সেই নীল রঙ মিশে গিয়ে যেন নীলিমার হাসিকে ছুঁয়ে এল। কষ্টের এক গভীর সাগরে ডুবে থেকেও সে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। আনন্দ আর দুঃখ যে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তা প্রকৃতি তাকে বুঝিয়ে দিল। শিমুলের ঝরে পড়া ফুলগুলো যেন তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বলল—"বিচ্ছেদই শেষ কথা নয়, স্মৃতিই অমর।"
অয়ন ফিরে আসার সময় দেখল একটি ছোট শিশু একা বসে কাঁদছে। তার হাতে রঙ নেই। অয়ন তার পকেটে থাকা বাকি আবিরটুকু আলতো করে শিশুটির গালে ছুঁইয়ে দিল। শিশুটি হেসে উঠল। সেই হাসির মধ্যে অয়ন আবার নীলিমাকে খুঁজে পেল।
প্রেম শুধু পাওয়ার নাম নয়, ত্যাগ আর স্মৃতির নামও প্রেম। হতাশার কালো মেঘ সরে গিয়ে অয়নের মনে আজ বসন্তের নতুন এ
ক রঙ লাগল—যাকে বলে ‘স্মৃতির রঙ’।

