গুচ্ছ কবিতা
অভিজিৎ হালদার
স্বাধীনতার ভোর
ভোরের আকাশে আজ অন্য রঙ
রক্তিম আলো গলে পড়ছে সবুজের চাদরে
যেন শতাব্দীর প্রতীক্ষিত চুম্বন
মায়ের কপালে লেগেছে স্বাধীনতার টিপ।
বাতাসে ভেসে আসে দূরের ডাকে
যেন অদৃশ্য কোনো বাঁশি বাজছে গঙ্গার ধারে
সাগরের জলে কাঁপছে সোনালি প্রতিফলন
পাহাড়ের বুকে দুলছে বিজয়ের পতাকা।
কখনো এই ভোর ছিলো শোকের মতো কালো
বুকের ভেতরে বন্দুকের শব্দ
গ্রামের গলিতে কাঁদতো মায়েরা
শূন্য ঘরে ফিরতো শুধু ধুলো।
ধানক্ষেতের সবুজে মিশে যেত লাল রঙ
যেন প্রতিটি ধানের শিষ শহীদের রক্তে ভেজা
যেন আকাশ জানে, মাটিও জানে—
এ জন্মজয়ী রঙ কেবল ত্যাগের ফসল।
আজ সেই মাঠে শিশু দৌড়ে যায়
মাঠের প্রজাপতির ডানায় ঝলমল করছে সূর্যের ছোঁয়া,
চাষির মুখে গান—স্বাধীনতা তুমি এসেছো এতকাল পর,
তার ঘামে মিলেছে শান্তি আর গর্ব।
ওহে স্বাধীনতার ভোর
তুমি এলে রক্তের স্রোত পেরিয়ে
মায়ের লুকানো কান্না
বাবার অবিচল নীরবতা ভেঙে।
আজ বাতাসে তোমার গন্ধ
স্বপ্নের গন্ধ, মুক্তির গন্ধ,
যেন আকাশ বাতাস সূর্য চন্দ্র একসাথে বলে—
তুমি স্বাধীন, তুমি আমার প্রাণ।।
শহীদের স্বপ্ন
কেউ জানতো না, সেই ছেলেটি ফিরবে না
যে সকালে বিদায় নিয়ে বলেছিল
মা, আমি যাচ্ছি, ফিরে আসবো বিজয় নিয়ে।
তার কণ্ঠে ছিল শপথের সুর
চোখে ছিল পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা।
কিন্তু দুপুরে রোদ ঝিমিয়ে এলে
গ্রামের পথ নীরব হয়ে গেল—
কেউ ফিরলো না, কেবল বাতাস এলো
সাথে নিয়ে এলো রক্তের খবর।
তার বুকের ক্ষত যেন নতুন মানচিত্রের দাগ
যে দাগে আঁকা হলো স্বাধীনতার রেখা—
রক্তে লেখা হলো ভারতবর্ষ
যেন ঈশ্বর নিজেই লাল কালি ছিটিয়ে দিলেন।
মা জানালার ধারে বসে শুনলো গুলি থামার পরের নিস্তব্ধতা
যেন সারা গ্রাম এক মুহূর্তে বৃদ্ধ হয়ে গেছে—
শিশুরা থেমে গেছে খেলায়
নদী থেমে গেছে গানে।
কিন্তু সেই রক্ত বৃথা যায়নি—
সেই রক্তের উষ্ণতায় জেগে উঠেছিল লাখো প্রাণ
তাদের কণ্ঠে উঠেছিল একই শব্দ—মুক্তি।
আজ আমি দাঁড়াই বিজয়ের সূর্যের নিচে
শহীদের ছবির দিকে তাকিয়ে শপথ নিই—
যতদিন নদী বইবে, যতদিন সূর্য আলো দেবে
ততদিন এই দেশ তার স্বপ্নে বেঁচে থাকবে।।
আমার স্বাধীনতা
আমার স্বাধীনতা কোনো সরকারি কাগজে বাঁধা নয়
সে জন্মেছে মাটির গন্ধে
সে বড় হয়েছে কৃষকের ঘামে
সে হাসে শিশুর চোখে
সে কাঁদে মায়ের নিঃশ্বাসে।
সে ছড়িয়ে আছে মন্দিরের ঘন্টাধ্বনিতে
মসজিদের আজানে
গির্জার প্রার্থনায়
বৌদ্ধবিহারের শান্ত প্রভায়।
আমার স্বাধীনতা পাহাড়ের কুয়াশায় ভেজা
সে সমুদ্রের ঢেউয়ে বুকে বাজে
সে শহরের কোলাহলে যেমন আছে
গ্রামের কাকডাকাতেও তেমন আছে।
যে হাত একদিন বন্দুক ধরেছিল
আজ সেই হাতে ধরা ফুল, বই, কলম—
কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তি নয়
সে শুরু করে দেশ গড়ার গল্প।
আমার স্বাধীনতা তাই অমলিন—
যতদিন ভালোবাসা বেঁচে থাকবে
যতদিন মানুষ মানুষকে চিনবে
যতদিন এই মাটিতে বসন্ত আসবে
আমার স্বাধীনতা ততদিন শ্বাস নেবে।।
