অবিরাম তুমি
তুমি আমার হৃদয়ের ঘোরলাগা দুপুর
জ্যোৎস্না রাতে বেজে ওঠা নির্ঘুম রাধার গীতি।
তোমার চোখে ছিলো অলিখিত অক্ষর
যা পড়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলতাম।
তুমি যখন হাঁটতে, বাতাস স্থির হতো
আমার বুকের মধ্যে কবিতা জন্ম নিত।
তোমার হাসি ছিলো আমার ঈশ্বর
আর নীরবতা ছিলো প্রার্থনার ছায়া।
একদিন তুমি বললে— ভালোবাসি
আমি সেই শব্দের ওজন বুঝে কেঁপে উঠলাম।
তুমি স্পর্শ করলে আমার চিরশীতল চরণ
আর আমি জ্বলতে লাগলাম আলোর মতো।
তোমার চোখে প্রেম ছিলো না শুধুই অভ্যাস—
তা ছিলো এক নীরব ধর্ম
যা কেবল হৃদয়ে বিশ্বাস জন্মায়।
আজও আমি তারই আরাধনায়
যেখানে তুমি নেই - তবু আছো
প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমার তুমি বলে ওঠে।
অপেক্ষার ব্যঞ্জনা
সে বলেছিলো, ফিরে আসবো—
আর আমি সে কথায় যুগ কাটিয়েছি।
একটি কাপ চা প্রতিদিন ঠান্ডা হয়েছে
একটি জানালা আজও খোলা আছে।
তার পায়ের শব্দ শুনি বাতাসে
কিন্তু সে আর আসে না, আর কখনো না।
সন্ধ্যার আলো চোখে কাঁপে—
তবু ছায়া পড়ে না কোনো।
চিঠির বাক্সে জমেছে ফেলে আসা দিন
যেখানে শুধু অপ্রেরিত ভালোবাসা ঘুমিয়ে।
আমার বালিশ জানে তার গন্ধ,
আমার ঘড়ি থেমে আছে সেই বিদায়ে।
পাখিরা আসে, গান গায়,
কিন্তু কোনো সুরে তার ডাক পাই না।
আকাশে চাঁদ ওঠে,
তবু সে মুখ নয়— যার জন্য আমি আকাশে তাকাই।
আজও মনে হয়, যদি সে ফিরতো হঠাৎ
আমি শুধু বলতাম—
এতদিন কোথায় ছিলে ?
নীল রাত্রির মুখোমুখি
রাত্রি যখন নামে
আমি নিঃশব্দে চোখ মেলি বিষাদের দিকে।
একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—
কিন্তু সে নয়, যে বলত ভালোবাসি।
ঘরের দেয়ালে তার ফেলে যাওয়া হাসি,
আয়নায় তার প্রতিচ্ছায়া কাঁদে।
একটি গন্ধ— ভিজে বইয়ের পাতার মতো,
আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতের অলিন্দে।
আজ কোনো শব্দ নেই আমার কণ্ঠে,
শুধু ধোঁয়া—
যা কবিতা হবার আগেই নিঃশেষ হয়।
আমার চোখে এখন বিষাদ পাথর হয়ে গেছে,
আর হৃদয়,
সে তো এক হারিয়ে যাওয়া ল্যাম্পপোস্ট—
যেখানে আলো নেই, ছায়া নেই, শুধু স্মৃতি।
এভাবে প্রতি রাত শেষ হয়
একটি নাম না-করা কান্নায়,
আর আমি ভোর দেখেও জাগি না আর।
বারুদের বুকেও প্রেম ছিলো
যুদ্ধ চলছিলো সীমান্তে
আর সে লিখছিলো প্রেমপত্র— রক্তের পাশে বসে।
তাকে বলেছিলাম, এই সময়ে প্রেম?
সে বলেছিল, এই সময়েই সবচেয়ে বেশি দরকার।
সে বলেছিল— প্রেমই একমাত্র শান্তি,
যা মানুষের শিরায় বাঁচতে শেখায়।
আমি তার চোখে দেখেছিলাম এক বিস্ময়,
যেখানে বারুদের ধোঁয়া আর ভালোবাসা একসাথে নাচত।
সে যুদ্ধে হারালো একটি হাত
তবু আমার মুখ ছুঁতে তার হৃদয় যথেষ্ট ছিলো।
সে লিখলো—
তোমার স্পর্শে যুদ্ধও পবিত্র লাগে।
আমি সেই চিঠি পড়ে কাঁপছিলাম—
কারণ এমন ভালোবাসা পৃথিবীর ইতিহাস লেখে।
যে ভালোবাসা বুলেটেও ভয় পায় না,
তাকে কে হারাতে পারে?
ফ্লোরেন্সের প্রেমিকা
তোমার নাম ছিলো লুইসা,
ইতালির ফ্লোরেন্সে দেখা— আমি পথ হারিয়ে ছিলাম।
তুমি বললে, Lost ?
আমি বললাম— Only in your eyes.
তুমি হাসলে—
সেই হাসিতে রোম আর রবি ঠাকুর একসাথে বাজল।
তুমি ছিলে আমার বাংলা গানের অনুবাদ—
একটি বিদেশী উচ্চারণে উচ্চারিত প্রেম।
তোমার চুলে ছিলো অলিভের গন্ধ,
আর আমার হাতে ছিলো গঙ্গার স্পর্শ।
আমরা দুটি ভাষা বুঝতাম না,
তবু হৃদয় অনুবাদে ভুল করতো না।
তুমি একদিন বললে, I go.
আমি জিজ্ঞেস করলাম— Will you come back?
তুমি বললে— Some love stays. No need to return.
আজও তুমি ফিরোনি,
তবু তোমার শহরের গলিতে হেঁটে যায়
একটি বাংলা নাম, শুধু তোমার জন্য।
