নীল খামের যুদ্ধ
প্রচণ্ড রোদের দুপুরে যখন শহরটা থাকে ক্লান্ত ও নীরব, তখন তোমার স্মৃতিরা এসে তোলে মনে এক অচেনা ক্ষোভ। তুমি আর আমি যেন দুটি ভিন্ন মেরুর তীব্র দুই মোহনা, আমাদের বোঝাপড়ায় কোনো দিনই ছিল না কোনো সান্ত্বনা।
তুমি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলে আমার মুখোমুখি প্রতিদিন, তোমার সাথে লড়তে লড়তেই কেটে গেছে কত না রঙিন দিন। নয়তো এই মহাবিশ্বের বিশালতার মাঝে কে ছিল এমন আপন, যে আমার সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে রাখত আনমন?
অন্য কেউ হলে কবেই দূরে সরে যেত আমার এই খামখেয়ালে, তুমি তো পারলে আমাকে তিল তিল করে ভাঙতে তোমার খেয়ালে। তোমার ওই কঠিন হাতের আঘাতে আজ আমি নতুন অবয়বে গড়া, তোমার সাথে এই লড়াইয়েই তো আমার জীবন জয়ে গড়া।
আজও টেবিলের কোণে পড়ে আছে পুরোনো সেই নীল ডায়েরির পাতা, যেখানে তোমার আমার যুদ্ধের গল্প লিখে গেছে নীরবতা। কে জিতেছে আর কে হেরেছে, তার হিসেব আজ আর কে রাখে, শুধু জানি তোমার দেওয়া এই ধ্বংসস্তূপেই আমার স্বর্গ ঢাকে।
ছায়ার কোলাহল
রাতের আকাশে তারার মেলা, হৃদয়ে জমে থাকা কত না মেঘ, তোমার সাথে দূরত্ব বাড়ার পর থেকেই শুরু হয় অদ্ভুত এক বেগ। তুমি ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এক বিপ্রতীপ কোণ, তোমার বিরোধিতাই তো বাঁচিয়ে রেখেছিল আমার এ মন।
অন্যরা তো কেবল পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আমার এই সুসময়ে, কেবল তুমিই পারলে আমাকে মাটিতে নামাতে এক অদ্ভুত নিয়ম লয়ে। তোমার সেই প্রতিবাদের ভাষা আজও আমার কানে বাজে ঝড়ের মতো, নয়তো এই পৃথিবীতে কে আর আমাকে চিনেছিল এত শত!
মহাবিশ্বের অন্তহীন পথ ধরে একা যখন হেঁটে যাই নিরিবিলি, তোমার ছায়া তখন পাশে এসে বলে, "ভুলে যাওয়ার নয় এ সিলি।" তুমি ছিলে বলেই তো আমার পরাজয়গুলো এত গৌরবের হলো, নয়তো আমার ভেতরের মানুষটা চিরকালই অন্ধকারে মরে রইল।
আজ আর কোনো আক্ষেপ নেই, নেই কোনো পুরোনো জমানো অভিমান, তোমার দেওয়া ক্ষতগুলোই আজ হয়ে উঠেছে আমার জীবনের সেরা গান। তুমি ধ্বংস করেছিলে ঠিকই, কিন্তু সেই ধ্বংসের মাঝে বুনেছিলে বীজ, আজ তাই তোমার দেওয়া এই শূন্যতাই আমার সবচেয়ে বড় চিজ।
বৈরী হাওয়া
জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা, আর তোমার শীতল দূরত্ব, আমাদের এই সম্পর্কের খাতাটা ছিল বড়ই অদ্ভুত ও রুক্ষ। তুমি আমার চেনা ভূগোলের সবচেয়ে কঠিন এক পাহাড় ছিলে, আমার সব নরম আবদার তোমার পাথরে এসেই মিলেছিল মিলে।
তুমি প্রতিপক্ষ ছিলে বলেই আমি কখনো থামিনি এক মুহূর্তের তরে, তোমার ভয়েই তো নিজেকে শক্ত করে গড়েছি জীবনভোরে। নয়তো এই বিশাল পৃথিবীতে কে আর এমন সাধ্য রাখত বলো, আমার মতো একরোখা মানুষকে এমন মোহাবিষ্ট করে রাখত কে বলো?
সবাই যখন বাহবা দিল, তুমি তখন আঙুল তুললে সোজা, তোমার সেই আঙুল তোলার মাঝেই ছিল আমার আসল কাজের বোঝা। তুমি হারিয়ে গেলে ঠিকই, কিন্তু রেখে গেলে এক দুর্নিবার শক্তি, তোমার ওই বিরোধিতাই শিখিয়ে দিল জীবন মানে কার প্রতি ভক্তি।
আজ চারপাশের এই কোলাহলে বড্ড বেশি একা লাগে যখন, তোমার সেই পুরোনো কথার রেশই জুড়িয়ে দেয় আমার এ মন। তুমি ছিলে বলেই আজ আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি একা, মহাবিশ্বের ভিড়ে এমন প্রতিপক্ষ কার জীবনেই বা মেলে দেখা!
অন্ধকারের কারিগর
আলোর চেয়ে অন্ধকারের টান যেন বড় বেশি মোহময়, আমাদের এই নীরব লড়াইয়ে কার জয় আর কার যে সংশয়! তুমি ছিলে আমার ঠিক বিপরীত স্রোতের এক দুর্নিবার ঢেউ, তোমার মতো করে আমায় চেনার সাধ্য ছিল না তো আর কেউ।
অন্যরা তো মোসাহেবি করে ভুলিয়ে দিত আমার সমস্ত ভুল, তুমি কেবল আঘাত করে ভেঙে দিতে আমার অহংকারের মূল। তোমার সেই নিষ্ঠুর সত্যগুলো বুকে বিঁধেছিল তীরের মতো, আজ বুঝি সেগুলোর জন্যই আমার ভেতরের আলো হয়েছে শত শত।
মহাবিশ্ব তো অনন্ত অসীম, তার গ্যালাক্সি আর কোটি তারার ভিড়ে, কেউ তো কখনো তাকাল না আমার এই ভাঙা হৃদয়ের তীরের দিকে। কেবল তুমিই পারলে আমার সমস্ত অহংকার ধূলিসাৎ করে দিতে, তোমার ওই প্রতিপক্ষ রূপটাই তো শিখিয়েছিল আমায় লড়তে জিতে।
আজ দূরত্ব অনেক যোজন, নেই আগের মতো সেই ছায়াঘেরা রাত, তবুও তোমার দেওয়া ক্ষতগুলো আজও শক্ত করে ধরে আমার হাত। তুমি ধ্বংস করেছিলে বলেই আজ আমি নিজের মতো করে গড়া, নয়তো এই অপূর্ণ জীবনে আমার আর কি-ই বা ছিল করার বা পড়ার!
নদীর দুই তীর
নদীর দুই তীর যেমন কভু এক হয় না মোটেই মিলনে, আমাদের মনও তেমনি ছুটেছে চিরকাল ভিন্ন দুই চরণে। তুমি ছিলে আমার ঠিক উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে থাকা এক চেনা মুখ, তোমার সাথে লড়াই করতে করতেই কেটে গেল আমার কত না অসুখ।
তুমি প্রতিপক্ষ না হলে আমি বুঝতেই পারতাম না আমার নিজের জোর, তোমার বিরোধিতাতেই তো আমার জীবনে এসেছিল আসল ভোর। নয়তো এই বিশাল জনসমুদ্রে কে আর এমন সাহস রাখত বুকে, আমার এই ভুলগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে মুখে মুখে!
সবাই যখন ভালোবেসে মাথায় তুলে রাখত আমার প্রতিটা ভুল, তুমি তখন কোণঠাসা করে ভেঙে দিতে আমার বানানো ভুলবুল। তোমার সেই চরম অবহেলা আর তীব্র প্রতিঘাতের আগুনে পুড়ে, আজ আমি এমন এক মানুষ হয়েছি, যে থাকে সব মোহ থেকে দূরে।
মহাবিশ্বের নিয়মে কে কার ধ্বংস চায় বা কে বা কাকে জেতায়, সে হিসেব রাখেনি কেউ আমাদের এই পোড়ো শহরের ঠিকানায়। তুমি ছিলে বলেই আজ আমি আমার এই অহংকারের শিখরে বসা, নয়তো কবে
ই হারিয়ে যেত আমার এই জীবনের সব আশা-ভরসা।
