বিষাদ-সিন্ধুর মালিনী
অভিজিৎ হালদার
সুহানা যখন রেস্তোরাঁর জানালার পাশে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, তখন বিকেলের নরম রোদ তার বাদামী চোখের মণিগুলোকে বাঘের চোখের মতো হিংস্র অথচ সুন্দরী দেখাচ্ছিল। বিপরীতে বসে থাকা অর্ঘ্য তখন বিভোর। সে পেশায় একজন স্থাপত্যশিল্পী। সুহানার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির মাঝে সে জ্যামিতিক নিখুঁত সৌন্দর্য খুঁজে পায়। অর্ঘ্য জানত না, এই নিখুঁত সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দক্ষ শিকারি।
সুহানার পুরো নাম সুহানা সেরিবিন আলিসা। সে নিজেকে পরিচয় দেয় একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হিসেবে, যার হাতে অফুরন্ত সময়। অর্ঘ্যর সাথে তার প্রণয় মাত্র চার মাসের। কিন্তু এই চার মাসেই অর্ঘ্য তার হৃদয়ের সবটুকু চাবি সুহানাকে সঁপে দিয়েছে। সুহানা তাকে ভালোবাসে, অন্ততঃ অর্ঘ্যর চোখে সেই মায়া কাজ করে। সুহানা মাঝে মাঝে অর্ঘ্যর হাত ধরে বলে, "জানো অর্ঘ্য, ভালোবাসা মানে হলো নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। একদম শেষ বিন্দু পর্যন্ত।" অর্ঘ্য হেসে বলত, "আমি তো বিলিয়েই দিয়েছি সুহানা।"
আজ অর্ঘ্যর জন্মদিন। সুহানা তাকে নিজের নির্জন বাগানবাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছে। শহর থেকে অনেকটা দূরে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই লুকোচুরি খেলে। বাগানবাড়িটি সুহানার রুচির মতোই মার্জিত। পুরোনো আমলের আসবাবপত্র আর আধুনিক আলোর কারসাজি। ডিনার টেবিলে আজ সুহানা নিজের হাতে রান্না করেছে। রেড ওয়াইনের গ্লাসে মোমবাতির আলো প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে।
"শুভ জন্মদিন, অর্ঘ্য," সুহানা খুব ধীর লয়ে বলল। তার কণ্ঠে একধরনের শীতল মাদকতা।
"ধন্যবাদ সুহানা। আজকের এই রাতটা আমার জীবনের সেরা রাত," অর্ঘ্য আবেগাল্পুত হয়ে পড়ল।
খাওয়া শেষ হতেই সুহানা একটি ছোট নীল রঙের ফাইল এগিয়ে দিল অর্ঘ্যর দিকে। সুহানার জীবনের সাথে যেন 'নীল' শব্দটার এক গভীর যোগ আছে—হয়তো কোনো গোপন বেদনার নীল ডায়েরির গল্প সে হৃদয়ে বয়ে বেড়ায়। অর্ঘ্য ফাইলটা খুলে দেখল, সেখানে কিছু নথিপত্র।
সুহানা হাসল, "এটা আমাদের ভবিষ্যতের ঘর। আমি চাই তুমি এটার ডিজাইন করো।"
অর্ঘ্য ফাইলটা দেখছিল, তখনই তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। চারপাশটা যেন দুলতে শুরু করেছে। সে সুহানার দিকে তাকাল। সুহানা স্থির বসে আছে, তার মুখে সেই চিরচেনা স্নিগ্ধ হাসি, কিন্তু চোখে কোনো আবেগ নেই।
"সুহানা... আমার... খুব খারাপ লাগছে। শরীরটা..." অর্ঘ্যর কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে।
"জানি অর্ঘ্য। তোমার হৃদস্পন্দন এখন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসবে। আমি তোমার ড্রিংকে অতি সামান্য ডিজিটালিস মিশিয়েছি। এটা হৃদযন্ত্রকে ক্লান্ত করে দেয়।" সুহানা খুব সহজভাবে কথাগুলো বলল, যেন আবহাওয়ার কথা বলছে।
অর্ঘ্য বিশ্বাস করতে পারছে না। সে টলতে টলতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়ল। সুহানা চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। খুব যত্ন করে অর্ঘ্যর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। তার লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে অর্ঘ্যর চুল সরিয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
"কেন...?" অর্ঘ্যর কণ্ঠস্বর এখন ফিসফিসে।
সুহানা শান্ত গলায় বলল, "কারণ ভালোবাসা যখন পূর্ণতায় পৌঁছায়, তখন সেটাকে থামিয়ে দিতে হয়। বেঁচে থাকলে তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসবে, অথবা আমরা একে অপরের প্রতি বিরক্ত হয়ে যাব। আমি চাই না আমাদের এই সুন্দর প্রেমটা পচে যাক। তুমি আমার কাছে স্মৃতি হয়ে চিরকাল নিখুঁত থাকবে। ঠিক আমার আগের প্রেমিকের মতো।"
অর্ঘ্যর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সে সুহানার প্রেমের প্রথম শিকার নয়। সুহানা আলিসা কোনো মানবী নয়, সে এক মায়াবী বিষকন্যা। অর্ঘ্যর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। সুহানার সুন্দর মুখটা তার চোখের সামনে শেষবারের মতো ভেসে উঠল। সুহানা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গুনগুন করে গাইতে লাগল এক বিষাদময় সুর।
মিনিট পাঁচেক পর অর্ঘ্যর দেহটা নিথর হয়ে গেল। সুহানা ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। সে খুব শান্তভাবে অর্ঘ্যর চোখের পাতা টেনে বন্ধ করে দিল। এরপর নিজের ড্রয়ার থেকে একটি ছোট ডায়েরি বের করল। সেখানে অর্ঘ্যর নামের পাশে একটি লাল দাগ টেনে দিল।
সুহানা উঠে দাঁড়াল। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের অন্ধকার বাগানের দিকে তাকাল। সেখানে পরবর্তী শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি তাকে নিতে হবে। তবে তার আগে অর্ঘ্যকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা বাকি। সুহানার কাছে মৃত্যু মানে কেবল শেষ নয়, মৃত্যু মানে হলো একটি স্মৃতিকে অমর করে রাখা।
••••••
অর্ঘ্যর মৃত্যুর ঠিক ছয় মাস পর। সুহানা এখন পাহাড়ি শহর শিলংয়ের এক নির্জন কটেজে। এখানে কুয়াশা জমে জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যায়, আর পাইন বনের শোঁ শোঁ শব্দে মনে হয় প্রকৃতি কোনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। এই নির্জনতা সুহানার খুব প্রিয়। এখানেই তার সাথে পরিচয় হলো নীল ডায়েরি ছদ্মনামের এক তরুণ কবির সঙ্গে। লোকমুখে শোনা যায়, তার আসল নাম অভিজিৎ হালদার।
অভিজিৎ একজন উথাল-পাথাল আবেগের মানুষ। তার কবিতায় যেমন বিরহ থাকে, তেমনি থাকে জীবনের প্রতি এক তীব্র তৃষ্ণা। সুহানা যখন প্রথমবার লাইব্রেরিতে বসে তার কবিতার বই পড়ছিল, অভিজিৎ নিজেই এসে আলাপ জমিয়েছিল। সুহানার আভিজাত্য আর রহস্যময় নীরবতা অভিজিৎকে চুম্বকের মতো টেনেছিল।
"আপনি কি কেবলই শব্দ পড়েন, নাকি শব্দের পেছনের হাহাকারটাও শুনতে পান?" অভিজিৎ জিজ্ঞেস করেছিল।
সুহানা বই থেকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল। তার সেই বিখ্যাত শীতল হাসি হেসে বলেছিল, "আমি হাহাকার শুনতে ভালোবাসি। কারণ হাহাকারই মানুষের সবচেয়ে সত্য রূপ।"
ব্যস, সেই শুরু। আগামী তিন মাস সুহানা আর অভিজিৎ যেন একে অপরের ছায়া হয়ে রইল। অভিজিৎ তার নতুন কাব্যগ্রন্থের নাম রাখল 'সুহানার মায়া'। সে জানত না, এই মায়া আসলে এক মরণফাঁদ। সুহানা তাকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত, মেঘের আনাগোনা দেখাত। অভিজিৎ মুগ্ধ হয়ে সুহানার জন্য কবিতা লিখত, আর সুহানা মনে মনে তার বিদায়ের দিনক্ষণ গুনত।
অভিজিৎ একদিন সুহানাকে বলল, "সুহানা, তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার মনে হয় আমি কোনো গভীর গহ্বরে পড়ে যাচ্ছি। সেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই।"
সুহানা তার চিবুক ছুঁয়ে বলেছিল, "ফিরতে চাও নাকি অভিজিৎ? ফেরার চেয়ে হারিয়ে যাওয়া কি বেশি রোমাঞ্চকর নয়?"
সেই রাতে সুহানার কটেজে মোমবাতি জ্বলছিল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি আর বজ্রপাত। অভিজিৎ তার নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছে সুহানাকে পড়ে শোনানোর জন্য। সুহানা আজ তাকে নিজের হাতে বানানো স্পেশাল 'ব্ল্যাক ফরেস্ট টি' পরিবেশন করল। চায়ের রঙটা গাঢ় লিকারের মতো, কিন্তু তাতে মেশানো ছিল এক বিশেষ ধরনের বিষ—যা মূলত স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে অবশ করে দেয়, অথচ মস্তিষ্কে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে।
অভিজিৎ কবিতা পড়তে শুরু করল:
"তোমার হাতের ছোঁয়ায় আজ বিষাদ হয়েছে নীল,
আমার বুকের খাঁচায় আজ স্তব্ধ গাঙচিল..."
কবিতা পড়তে পড়তে অভিজিতের হাত কাঁপতে শুরু করল। সে অনুভব করল তার আঙুলগুলো আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল।
"সুহানা... আমার শরীরটা কেমন হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে আমি ভাসছি," অভিজিৎ অসংলগ্নভাবে বলল।
সুহানা তার পাশে এসে বসল। অভিজিতের মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল। খুব কোমল স্বরে বলল, "তুমি তো উড়তে চেয়েছিলে কবি। দেখো, আজ তোমার সব ভার নেমে যাচ্ছে। তোমার এই অমর কবিতাগুলো তখনই সার্থকতা পাবে, যখন কবি নিজে মিথ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকলে তুমি হয়তো সাধারণ এক সংসারী হয়ে যেতে, আমি সেটা হতে দিতে পারি না।"
অভিজিতের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে কথা বলতে চাইল, কিন্তু তার জিভ আড়ষ্ট হয়ে গেছে। সে দেখতে পেল সুহানা তার পকেট থেকে সেই 'নীল ডায়েরি'টি বের করল। যে ডায়েরিতে অভিজিৎ তার জীবনের সব গোপন কথা আর কবিতা লিখে রাখত।
সুহানা ডায়েরিটা খুলে একটি ফাঁকা পাতায় লিখল— "সমাপ্তি।"
অভিজিতের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে গেছে সুহানার গলার হারের দিকে। সেই হারে একটি ছোট লকেট ঝুলছে, যেখানে হয়তো তার আগের শিকার অর্ঘ্যর কোনো চিহ্ন রাখা আছে। অভিজিতের হৃদপিণ্ড শেষবারের মতো একবার কেঁপে উঠে থেমে গেল। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ রইল না ঘরে।
সুহানা দীর্ঘক্ষণ অভিজিতের নিথর দেহের পাশে বসে রইল। তারপর খুব যত্ন করে তার পাণ্ডুলিপিগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ভরল। সে জানে, এই কবিতাগুলো যখন প্রকাশিত হবে, তখন বিশ্ব একজন মহান কবিকে হারানোর শোকে মুহ্যমান হবে। আর সুহানা? সে তখন অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো নামে, নতুন এক হৃদয়ের সন্ধানে ব্যস্ত থাকবে।
পরের দিন ভোরে যখন পুলিশ কটেজে পৌঁছাল, তখন সেখানে কেবল কবির নিথর দেহ পড়ে ছিল। সুহানা সেরিবিন আলিসা ততক্ষণে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নেমে গেছে। তার ব্যাগে এখন নতুন একটি নীল ডায়েরি, যা তার সংগ্রহের তালিকায় যোগ হলো।
•••••
শহরের নামজাদা কার্ডিওলজিস্ট ড. আরিয়ান রেহমান। অত্যন্ত মেধাবী, গম্ভীর এবং কিছুটা অন্তর্মুখী। আরিয়ানের জীবন কাটে স্টেথোস্কোপ আর হার্টবিটের ছন্দ মেপে। প্রেমের মতো 'অযৌক্তিক' বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ ছিল না, যতক্ষণ না তার চেম্বারে একদিন সুহানা সেরিবিন আলিসা এসে দাঁড়াল।
সুহানা এবার এসেছে এক কাল্পনিক হার্টের সমস্যা নিয়ে। ড. আরিয়ান পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন সুহানার ইসিজি রিপোর্ট একদম স্বাভাবিক, কিন্তু মেয়েটির চোখের দিকে তাকালে তার নিজের হার্টবিট অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। সুহানা খুব মৃদু স্বরে বলল, "ডাক্তার সাহেব, আমার মনে হয় আমার হৃদপিণ্ডে একটা ছিদ্র আছে, যেখান দিয়ে সব অনুভূতি বেরিয়ে যায়। আপনি কি সেটা সেলাই করে দিতে পারবেন?"
আরিয়ানের মতো বাস্তববাদী মানুষও সেই মায়াবী কথায় কুপোকাত হলেন। শুরু হলো এক অসম প্রেমের গল্প। আরিয়ান সুহানাকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাইতেন ভালোবাসা আসলে মস্তিষ্কের ডোপামিন আর অক্সিটোসিনের খেলা। সুহানা হাসত। সে মনে মনে ভাবত, "আরিয়ান, তোমার এই বিজ্ঞান কি পারবে সেই বিষের প্রতিষেধক দিতে, যা আমি তোমার শিরায় বইয়ে দেব?"
ছয় মাস কেটে গেল। আরিয়ান এখন সুহানার প্রেমে অন্ধ। তিনি সুহানাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। সুহানা সম্মতি জানাল, তবে এক শর্তে—বিয়ের আগে তারা আরিয়ানের ব্যক্তিগত ফার্মহাউসে একটি নিভৃত রাত কাটাবেন। আরিয়ান রাজি হলেন। তিনি জানতেন না, সুহানা তার প্রতিটি প্রেমিকের জন্য একটি করে 'থিম' নির্বাচন করে। অর্ঘ্যর জন্য ছিল স্থাপত্য, অভিজিতের জন্য কবিতা, আর আরিয়ানের জন্য সে বেছে নিয়েছে—'মেডিকেল সায়েন্স'।
ফার্মহাউসের ডিনারে সুহানা নিজ হাতে স্টেক রান্না করল। সাথে দামী শ্যাম্পেইন। আরিয়ান গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, "সুহানা, তুমি আসার পর আমার লাইফটা লজিকের বাইরে চলে গেছে। আমি কল্পনাও করিনি আমি কাউকে এত ভালোবাসতে পারব।"
সুহানা গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত ক্রুরতা। "আরিয়ান, তুমি তো হার্ট নিয়ে ডিল করো। তুমি জানো কি, একটা মৃত হৃদপিণ্ড কতক্ষণ সতেজ থাকে?"
আরিয়ান অবাক হলেন। "হঠাৎ এসব কথা কেন?"
"কারণ, আমি দেখতে চাই তোমার সেই ডোপামিন আর অক্সিটোসিন লেভেলটা ঠিক কখন শূন্যে নেমে আসে।"
আরিয়ানের হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে ভেঙে গেল। তিনি অনুভব করলেন তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। প্যারালাইসিসের মতো অবস্থা। আরিয়ান বুঝতে পারলেন, এটা সাধারণ কোনো ড্রাগ নয়। এটা 'সাকসিনাইলকোলিন' (Succinylcholine)—যা পেশিকে অবশ করে দেয় কিন্তু মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখে। তিনি চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেছে।
সুহানা একটা ছোট সার্জিক্যাল স্কেল্পেল বের করল তার ব্যাগ থেকে। সে আরিয়ানের একদম কাছে এসে বসল। আরিয়ানের চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, তিনি নড়তে পারছেন না, শুধু অপলক তাকিয়ে আছেন।
সুহানা মৃদুস্বরে বলল, "ভয় পেও না আরিয়ান। আমি তোমাকে কষ্ট দেব না। আমি শুধু দেখতে চাই, তোমার এই বৈজ্ঞানিক হৃদপিণ্ডটা শেষ মুহূর্তে কার নাম নেয়। তুমি তো বলেছিলে ভালোবাসা একটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন। দেখো, এখন তোমার শরীরের সব রিঅ্যাকশন আমার হাতের মুঠোয়।"
সুহানা খুব সাবধানে আরিয়ানের বুকে একটা ছোট আঁচড় কাটল। তারপর তার কান ঘেষে বলল, "অর্ঘ্যর স্মৃতিগুলো ধুলো হয়ে গেছে, অভিজিতের কবিতাগুলো নীল হয়ে গেছে। আর তুমি? তুমি আমার সংগ্রহশালায় থাকবে একটা নিখুঁত রিপোর্ট হয়ে।"
আরিয়ানের শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। তিনি দেখতে পেলেন সুহানা খুব নির্লিপ্ত মুখে তার ফোনটা বের করে গান শুনছে। আরিয়ানের পৃথিবী ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে এল। তার শেষ অনুভূতি ছিল সুহানার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ, যা তার কপালে রাখা ছিল।
পরদিন সকালে যখন কর্মচারীরা ফার্মহাউসে এল, তারা দেখল ড. আরিয়ান সোফায় বসে আছেন, যেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। তার মুখটা খুব শান্ত। শুধু টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটি ছোট চিরকুট, যাতে লেখা— "বিজ্ঞান যেখানে শেষ হয়, মায়া সেখান থেকেই শুরু হয়।"
সুহানা ততক্ষণে শহরের সীমানা পেরিয়ে অন্য এক গন্তব্যে। তার সংগ্রহে এখন আরিয়ানের একটি প্রিয় ঘড়ি আর তার মৃত্যুর সেই রিপোর্ট। সুহানা সেরিবিন আলিসা তার ডায়েরিতে তৃতীয় পাতাটা উল্টে দিল।
•••••
ড. আরিয়ানের মৃত্যুর পর সুহানা কিছুদিন আড়ালে ছিল। সে জানত, পরপর তিনটি রহস্যময় মৃত্যু (যদিও প্রতিটিই স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে) কোনো না কোনো তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের নজরে আসবেই। আর ঠিক তাই হলো। সুহানার ওপর নজর পড়ল বেসরকারি গোয়েন্দা ইফতেখার আহমেদের। ইফতেখার খুব ধুরন্ধর মানুষ, সে তথ্যের চেয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব পড়তে বেশি ভালোবাসে।
সুহানা এটা জানত। তাই সে নিজেই ইফতেখারের সামনে গিয়ে ধরা দিল। তবে অপরাধী হিসেবে নয়, একজন 'মক্কেল' হিসেবে। সে জানাল, তার পিছু কেউ নিয়েছে এবং সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইফতেখার প্রথম দেখাতেই সুহানার রূপে মুগ্ধ হলেন না ঠিকই, কিন্তু তার রহস্যময় ব্যক্তিত্বে আটকে গেলেন। তিনি সুহানাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতে শুরু করলেন।
সুহানা জানত, গোয়েন্দাকে মারতে হলে তাকে তথ্যের গোলকধাঁধায় ফেলতে হয়। সে ইফতেখারের সাথে লাইব্রেরিতে যেত, পুরনো কফি শপে আড্ডা দিত। ইফতেখার লক্ষ্য করলেন, সুহানা সবসময় একটা নীল ডায়েরি সাথে রাখে। তিনি ভাবলেন, এই ডায়েরিতেই হয়তো সব রহস্যের চাবিকাঠি আছে।
ইফতেখার একদিন সুহানাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, "আলিসা, তোমার এই ডায়েরিটা কি আমি একবার দেখতে পারি? আমার মনে হচ্ছে তোমার সব ভয়ের উৎস এখানেই।"
সুহানা রহস্যময় হাসল। "ইফতেখার সাহেব, গোয়েন্দারা সবসময় অন্যের ডায়েরি পড়তে চায় কেন? এটাতে তো আমার ব্যক্তিগত কবিতা আর কিছু নীল বেদনা লেখা আছে। আপনি কি নীল রঙ সহ্য করতে পারবেন?"
ইফতেখার জেদ ধরলেন। তিনি সুহানার প্রতি এক ধরনের অধিকারবোধ অনুভব করতে শুরু করেছেন। শিকারি নিজেই যখন শিকারে পরিণত হয়, তখন তার পতন অনিবার্য। সুহানা তাকে তার শহরের বাইরের পুরনো স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে আমন্ত্রণ জানাল। বলল, "আজ রাতে আমি আপনাকে আমার ডায়েরিটা পড়তে দেব। কিন্তু তার আগে একটা খেলা খেলতে হবে—'ট্রুথ অর ডেয়ার'।"
সেই রাতে স্টুডিওতে আবছা আলো। টেবিলে রাখা দামী রাম । ইফতেখার প্রতিটি পদক্ষেপে সাবধানী ছিলেন, তিনি সুহানার দেওয়া কোনো পানীয় সরাসরি খাননি। নিজের ফ্লাস্ক থেকে জল খাচ্ছিলেন। সুহানা তা দেখে হাসল, "আপনি খুব সতর্ক ইফতেখার। কিন্তু আপনি কি জানেন, বিষ কেবল পেটে গেলেই কাজ করে না?"
ইফতেখার ভ্রু কুঁচকালেন। "মানে?"
সুহানা স্টুডিওর দেওয়ালে রাখা একটি পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ডার চালিয়ে দিল। ঘরে ছড়িয়ে পড়ল এক তীব্র সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়া। সুহানা ডায়েরিটা ইফতেখারের হাতে দিল।
ইফতেখার দ্রুত ডায়েরিটা খুললেন। কিন্তু দেখলেন পাতাগুলো সব ফাঁকা। কেবল মাঝখানের পাতায় একটি ছোট শুকনো নীল ফুল আঠা দিয়ে লাগানো। তিনি পাতাটা উল্টাতে গিয়ে অনুভব করলেন তার আঙুলের ডগায় সামান্য জ্বালা করছে।
সুহানা খুব শান্ত গলায় বলল, "এই ডায়েরির পাতায় আমি 'ডাইমেথাইল মার্কারি' (Dimethylmercury) মাখিয়ে রেখেছি ইফতেখার। এটা ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। আর এই ধূপের ধোঁয়ায় আছে এমন এক রাসায়নিক, যা আপনার ফুসফুসকে ধীরে ধীরে ব্লক করে দেবে। আপনি খুব সাবধানে জল খেয়েছেন, কিন্তু আপনি চামড়া আর বাতাসকে আটকাতে ভুলে গেছেন।"
ইফতেখারের শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। তার স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছেন। এই মেয়েটি কোনো সাধারণ খুনি নয়, সে একজন শিল্পী।
"কেন... সুহানা? আমি তো তোমাকে... ভালোবেসে ফেলেছিলাম," ইফতেখার কষ্টে বললেন।
সুহানা তার কানে কানে বলল, "গোয়েন্দা আর খুনি—দুজনেই তো সত্যের সন্ধানে থাকে। আমি সত্যকে স্থির করে দিই মৃত্যুর মাধ্যমে। আপনি আমার রহস্য সমাধান করতে চেয়েছিলেন, তাই না? এই নিন আপনার সমাধান—আমি নিজেই এক অন্তহীন রহস্য। আপনাকে মারতে আমার খারাপ লাগছে ইফতেখার, কারণ আপনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আমার ডায়েরিটা ছুঁয়ে দেখার সাহস করেছেন।"
ইফতেখার সোফার ওপর ঢলে পড়লেন। তার শেষ দৃষ্টিতে ছিল সেই নীল ডায়েরিটা, যা এখন মেঝেতে পড়ে আছে। সুহানা রুমাল দিয়ে খুব সাবধানে ডায়েরিটা তুলে নিল। ইফতেখারের পকেট থেকে তার আইডি কার্ডটা বের করে নিজের ব্যাগে ভরল—এটা তার চতুর্থ স্মারক।
বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সুহানা অ্যাপার্টমেন্টের দরজা লক করে দিয়ে বেরিয়ে এল। সে জানে, পুলিশ আসবে, তদন্ত হবে, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে না। কারণ বিষাক্ত গ্যাস আর স্পর্শের বিষ ততক্ষণে বাতাসে মিলিয়ে যাবে।
সুহানা এখন চারজন প্রতিভাবান পুরুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
•••••
চারজন মানুষকে নিখুঁতভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর সুহানা এখন সম্পূর্ণ একা। তার হাতে এখন প্রচুর অর্থ, ব্যাগে চারটি স্মারক আর হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে ফিরে এসেছে তার পৈতৃক ভিটেয়—সমুদ্রের ধারের এক প্রাচীন প্রাসাদে। যেখানে ঢেউয়ের গর্জনে সারারাত হাহাকার শোনা যায়। সুহানা ঠিক করেছে, সে আর কাউকে খুন করবে না। তার সংগ্রহশালা পূর্ণ।
কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল। সুহানার জীবনে এবার প্রবেশ করল নীল। কেবল 'নীল'—তার কোনো পদবী নেই, কোনো পরিচয় নেই। সে এই প্রাসাদের বাগানে মালি হিসেবে কাজ নিতে এসেছে। নীলের চোখ দুটো ঠিক সুহানার মতো—গভীর, রহস্যময় এবং আবেগহীন। সুহানা প্রথমবার কাউকে দেখে চমকে উঠল। মনে হলো, সে যেন নিজেরই এক পুরুষ সংস্করণকে দেখছে।
সুহানা নীলকে খুব কাছে টেনে নিল। সে দেখতে চাইল, এই সাধারণ মালি কি তার বিষ সহ্য করতে পারবে? নাকি সে নিজেই নীলের মায়ায় জড়িয়ে পড়বে? কয়েক মাস কাটল। নীল সুহানার জন্য প্রতিদিন নীল অপরাজিতা ফুল নিয়ে আসত। সুহানা লক্ষ্য করল, নীল তার সম্পর্কে সবকিছু জানে। সে জানে সুহানা রাতে ঘুমানোর আগে কার নাম বিড়বিড় করে, সে জানে সুহানার ব্যাগে চারটে মানুষের চিহ্ন লুকানো আছে।
সুহানা ভয় পেল না, বরং উত্তেজিত হলো। সে নীলকে তার জীবনের শেষ শিকার হিসেবে বেছে নিল। "নীল, আজ রাতে আমরা সমুদ্রের পাড়ে ডিনার করব," সুহানা বলল।
নীল হাসল, "আমি জানি সুহানা। আজকের রাতটা আমাদের দুজনের জন্যই শেষ রাত।"
সমুদ্রের ধারে বালুচরে ডিনারের আয়োজন। সুহানা এবার কোনো রাসায়নিক বা ড্রাগ ব্যবহার করল না। সে এবার ব্যবহার করল প্রাচীন এক বিষ—'অ্যাকোনাইট' (Aconite), যা লোহা দিয়ে তৈরি গ্লাসে মেশালে কোনো স্বাদ বা গন্ধ থাকে না। সুহানা নিজের গ্লাসেও বিষ মিশিয়েছিল, কারণ সে চেয়েছিল নীলের সাথে একসাথেই এই পৃথিবী ছাড়তে। সে ক্লান্ত। সে আর কোনো স্মৃতি জমাতে চায় না।
"চিয়ার্স নীল," সুহানা গ্লাস তুলল।
নীল তার গ্লাসটা সুহানার গ্লাসে ঠেকিয়ে বলল, "চিয়ার্স আলিসা। তোমার ডায়েরির শেষ পাতাটা আজ পূর্ণ হবে।"
দুজনেই পানীয় শেষ করল। কিছুক্ষণ পর সুহানা অনুভব করল তার বুক ফেটে যাচ্ছে। সে বালির ওপর শুয়ে পড়ল। কিন্তু নীল? নীল একদম স্বাভাবিক বসে আছে। সে সুহানার দিকে তাকিয়ে করুণার হাসি হাসছে।
"তুমি... তুমি মরছ না কেন নীল?" সুহানা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল।
নীল সুহানার পাশে এসে বসল। তার পকেট থেকে বের করল একটি অতি পরিচিত বস্তু—একটি পুরনো, জীর্ণ নীল ডায়েরি। সুহানার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এটা তো তার বাবার ডায়েরি!
নীল শান্ত গলায় বলল, "সুহানা সেরিবিন আলিসা, তুমি যাদের খুন করেছ, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে মেধাবী ছিল। কিন্তু তুমি জানো না, তোমার বাবাও একজন খুনি ছিলেন। তিনি তোমার মাকে ঠিক এভাবেই বিষ দিয়ে মেরেছিলেন। আমি সেই মায়ের অন্য এক সন্তান। তোমার সৎ ভাই। আমি গত দশ বছর ধরে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করছি। আমি জানতাম তুমি আজ আমাকে মারতে চাইবে, তাই আমি তোমার গ্লাসের বিষটা বদলে দিয়েছিলাম। তুমি যে বিষ নীলকে দিতে চেয়েছিলে, সেই বিষেই আজ আলিসার শেষ হবে।"
সুহানা হাসতে চাইল, কিন্তু রক্ত বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। সে বুঝতে পারল, সে সারাজীবন যাদের শিকার ভেবেছে, আসলে সে নিজেই ছিল পরিস্থিতির শিকার। তার রক্তে ছিল খুনের নেশা, যা সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। নীল ডায়েরির রহস্য আসলে কোনো প্রেম নয়, এটা ছিল এক বংশগত অভিশাপ।
সুহানা দেখল নীল উঠে দাঁড়াচ্ছে। নীল তার ব্যাগ থেকে চারজন প্রেমিকের স্মারকগুলো বের করে সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিল। তারপর সুহানার সেই বিখ্যাত নীল ডায়েরিটা বের করে তার বুকের ওপর রাখল।
"তোমার গল্প শেষ সুহানা। তোমার প্রেমিকেরাই এখন তোমার কবর পাহারা দেবে," নীল ধীর পায়ে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে গেল।
সুহানা সেরিবিন আলিসা আকাশের দিকে তাকাল। সমুদ্রের লোনা জল তার পায়ের পাতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখে এখন আর কোনো মায়া নেই, কোনো হিংস্রতা নেই। আছে কেবল এক গভীর শান্তি। সে চোখ বন্ধ করল। নীল ডায়েরির শেষ পাতাটি সমুদ্রের হাওয়ায় উড়তে শুরু করল, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল— "ভালোবাসা মানে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, একদম শেষ বিন্দু পর্যন্ত।"
পরদিন সকালে জেলেরা সৈকতে এক অপূর্ব সুন্দরী নারীর নিথর দেহ খুঁজে পেল। তার পাশে
পড়ে ছিল একটি ফাঁকা নীল ডায়েরি। সুহানা সেরিবিন আলিসা নিজেই এখন এক অমর রহস্য হয়ে সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।
